বুধবার গুলশান-২ নম্বরে ৩৬ রোডের ৯ নম্বর বাড়িতে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের গুলশানের বাসায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশের কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক শুরু হয় এতে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার, ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত, কানাডার উপরাষ্ট্রদূত ও জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।। বৈঠকটি শেষ হয় দুপুর ১২টার আগেই



দেশ সংবিধানমতো চলছে না’ বলে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত, যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনার এবং কানাডার উপরাষ্ট্র দূতের কাছে নালিশ করেছেন সংবিধান প্রণেতা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন।

বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) গুলশানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খানের বাসায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার, অ্যালিসন ব্লেইক এবং কানাডার উপ-রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে এ নালিশ করেন তিনি।

ওই বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী; জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)-এর সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, নাগরিক ঐক্য’র আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী।

বৈঠকটি সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়ে চলে দুপুর সোয়া ১২টার পর্যন্ত। বৈঠক শেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি নেতারা মিডিয়ার সঙ্গে কোনো কথা বলেন নি।

কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা


বৈঠকসূত্রে জানা যায়, শুরুতেই রবার্ট মিলার এবং অ্যালিসন ব্লেইক জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের কাছে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। পাশাপাশি তারা এও জানতে চান, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা এখন কী করবেন বা কী করতে চান? এ ব্যাপারে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তাদের চাওয়াটা কী?

জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, ’বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনারা অবগত আছেন। নতুন করে কিছু বলার নেই। আপনারা জানেন, বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী চলছে না। যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য থেকে সরকার সরে গেছে। রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে নেই। যে সরকার দেশ চালাচ্ছে, সেটা জনগণের ভোটে প্রতিষ্ঠিত না। একটা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান পার্লামেন্ট গঠন করা হয়েছে।’

সূত্রমতে, ড. কামালের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রবার্ট মিলার বলেন, ’আপনারা তো সেই পার্লামেন্টে গেছেন। এখন কী বুঝছেন?’

রবার্ট মিলারের এ প্রশ্নের জবাবে, ’ড. কামাল হোসেন বলেন, এই সংসদকে তো আমরা সংসদই মনে করি না। তারপরও যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা সংসদে গেছেন গণতন্ত্র চর্চার ন্যূনতম সুযোগটুকু কাজে লাগাতে। তারা সেখানে যতটুকু সুযোগ পাচ্ছেন কথা বলছেন। কিন্তু এ অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন। আপনারা আপনাদের জায়গা থেকে এ সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। দ্রুত একটা নির্বাচন আয়োজন করার।’

সূত্রমতে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কূটনীতিকদের বলেন, ’বিরোধী দলের নেতা-কর্মী সমর্থকদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। কারাবন্দি খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। দেশের স্থিতিশীল অবস্থা বজায় রাখতে এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে খালেদা জিয়ার মুক্তি অত্যন্ত জরুরি। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে থেকেই এ ব্যাপারে আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি।’

ড. কামাল হোসেন এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের পাশাপাশি আ স ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ড. মঈন খান বিভিন্ন পয়েন্টে কথা বলেন। রবার্ট মিলার ও অ্যালিসন ব্লেইক তাদের সবার কথা শোনেন। তবে কোনো মতামত জানান নি করেননি তারা।



এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বৈঠকে অংশ নেওয়া গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ’তারা (কূটনীতিকরা) শুধু জানতে চান। নিজে থেকে তারা কিছু বলেন না। আমরা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছি। সেখানে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, খালেদা জিয়ার মুক্তি, বিরোধী দলের নেতাকর্মীর ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এসব বিষয়ের ওপর ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিস্তারিত কথা বলেছেন।’

’আসলে তারা (কূটনীতিক) তো সবই জানেন। তারপরও আমাদের কাছ থেকে বিষয়গুলো জানতে চান। বুঝতে চান আমাদের মনোভাবটা কী?’— বলেন সুব্রত চৌধুরী।

সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, খালেদা জিয়া মুক্তির বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরবে তারা। সেই উদ্যোগের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদেরকে সম্পৃক্ত করে বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি।


উল্লেখ্য,কামাল হোসেন (জন্ম বরিশালের শায়েস্তাবাদে) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিবিদ এবং মুক্তিযোদ্ধা। সচরাচর তাঁকে "ডঃ কামাল হোসেন" হিসাবে উল্লেখ করা হয়। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২-এর ৮ই জানুয়ারি শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁকেও মুক্তি দেয়া হয়। তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে ১০ জানুয়ারি লন্ডন হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি সর্বদাই সোচ্চার। তাঁকে ব্যক্তিগত সততা, ন্যায্যতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসাবে সাধারণভাবে সম্মান করা হয়।