অবশেষে দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসলেন হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রী কবি গুলতেকিন খান। বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আফতাব আহমদ। দুই সপ্তাহ আগে ছোট পরিসরে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয় ঢাকায়। বুধবার এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই গুলতেকিনকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন আবার নেতিবাচক কথাও বলছেন কউ কেউ।

আরো পড়ুন

Error: No articles to display



একটি ছোট্ট পোস্ট গুলতেকিন খানের, বন্ধুদের, কাছের প্রিয় মানুষদের তুমুল শুভেচ্ছা বাণীতে ভরে গেল কমেন্ট বক্স। চোখ রেখেছিলাম সেই পোস্টে। সুখবরটা দ্রুতই পেলাম। অসম্ভব এক ভালো লাগায় ভরে গেল সমস্ত মন।

পনেরোটি বছর হলো যে খবরটি শুনতে চেয়েছি, অবশেষে সে শুভ খবরটি এলো। অথচ এটি হওয়া দরকার ছিল সেই বছর পনেরো আগেই।

কী ছিল সেই পোস্টটিতে!

হমম, অবদমিত বাঙালী সমাজে ঝড়-তুফান উঠারই কথা!

পাশাপাশি যাঁকে ঘিরে এই ঝড়-তুফানের আভাস, চলুন দেখি ঊনি কী লিখছেন –

দুপক্ষের বন্ধুরাই আজ উদ্বেলিত, ভালবাসায়, শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দিয়েছেন দুজনের জীবন। এরকমটাই তো হওয়ার কথা ছিল, তাই নয় কী! কিন্তু আমাদের সমাজ-বাস্তবতা আমাদের কী অপচয়ের দুয়ারে ছুঁড়ে দেয়, কেউ দেখতেও আসে না সেই জীবনটুকু!

আহারে জীবনের কী অসীম অপচয়! সমাজ সংসার সন্তান এর চক্রে নারী জীবনের এমন অপচয় আবহমানকাল থেকেই চলে আসছে। এ যেন এক অলিখিত রীতি। মধ্যবয়সে স্বামীহারা হয়েছো, ব্যস একাকি জীবনযাত্রা শুরু হলো। স্বামী মরে গিয়ে স্বামীহারা হও, আর বিচ্ছেদে স্বামীহারা হও, এবার থেকে তোমার একার জীবন।

আর সন্তানরা বড় হলে তো কথাই নেই। কদিন বাদে মেয়ের বিয়ে, ছেলের ঘরে বউ আসবে, এখন কিনা নিজেই বউ হতে চাও? ছিঃ নষ্টা বৈ তো তুমি আর কিছু নও। আবার বিয়ে না করে কোন বন্ধুমহলে দু একজন পুরুষের সাথে সুস্থ আড্ডা দেবে? তবে তো চারিদিকে ছিঃ ছিঃ রব পড়ে যাবে। ডিভোর্স হয়ে মহিলাটা খারাপ হয়ে গেছে। এতোই যখন পুরুষের দরকার তখন বিয়ে করে নে বাবা, ইসলামে তো বিয়ে করতে নিষেধ করেনি।

থামেন। এতো সহজ না। বলতে গেলে এ বেলা এমন করেই বলবে। আবার বিয়ে করলে ঐ ছিঃ ছিঃ রবই উঠবে। ইয়াল্লা! উনার না এতো বড় বড় ছেলে মেয়ে! নাতিপুতিও তো আছে শুনেছি।

হুমায়ুন আহমেদ যখন অভিনেত্রী শাওনকে বিয়ে করেন তখন তার বয়স ছিল ৫৬ বছর। আজ গুলতেকিনের বয়সও ৫৬ চলে। যদিও দেখতে তাকে তিরিশের তিলোত্তমাই লাগে। ৫৬ বছর বয়সে একজন পুরুষ যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন, একজন নারী কেন পারবেন না? তিনি নারী বলে?

গুলতেকিন ছিলেন সকলের প্রিয় একজন নারী। এই নারীকে প্রথম জানে সবাই তাদের প্রিয় বইয়ের ফ্ল্যাপের মাঝে। স্বত্ব! গুলতেকিন আহমেদ। শাওনকে বিয়ে করার আগে হুমায়ূন আহমেদের সব বইয়েই এই শব্দগুলো অতি চেনা ছিল। এখন তিনি গুলতেকিন খান। শুধু কি বইয়ের শুরুতে? কত বইয়ের ভিতরেও গুলতেকিনকে নিয়ে লেখকের ভালবাসার কথা ব্যক্ত ছিল, তাতো কারও অজানা নয়।

ধনীর দুলালী গুলতেকিন নিতান্ত মধ্যবিত্ত, নাম যশহীন হুমায়ূনকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন। আমেরিকার কঠিন জীবনে হুমায়ূনকে গবেষণা করতে দিয়ে সংসারের বোঝা একাই নিয়েছিলেন কাঁধে।দেশে ফিরেও সে সংসারের ভার একা গুলতেকিনই সামলাতেন। এমন বাতিঘর থাকতেও লেখকের গুহাচিত্র আঁকার জন্য আলোর দরকার হয়েছিল। তিনি সেই আলো ধরতে শাওনকে অনুরোধ করেছিলেন। সে কাহিনী সবার জানা।



শামীমা জামান, ছবিটি এঁকেছেন -তাহমিনা মিতা

সেই কঠিন সময়ে গুলতেকিনের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, নীরব থাকার মাঝে সব অপমান ভুলে যাওয়া এসবই তাকে একটা লৌহ মানবী রূপ দিয়েছিলো। অথচ বাস্তবের গুলতেকিন সরল মনের এক নরম মানুষ। বিচ্ছেদ পরবর্তী সময়ে হুমায়ূন সম্পর্কে একটি নেতিবাচক কথাও তিনি বলেননি। কিন্তু প্রবল জনপ্রিয় লেখক কি গুলতেকিনের স্বামীরূপে ভালো ছিলেন? (যদিও শাওনের স্বামীরূপে তিনি ছিলেন অসাধারণ এক প্রেমিক স্বামী!)

তাদের সুখের কথাগুলো লেখক বইয়ে যেমন জানান দিয়েছেন, তেমনি নেতিবাচক কথাগুলো গুলতেকিন চেপেই রেখেছেন নিজের মাঝে সারাজীবন। লেখকের মৃত্যুর পর কোনো এক সাক্ষাৎকারে গুলতেকিন লেখক সম্পর্কে সাধারণ দু একটি নেতিবাচক কথা মাত্রই আওড়েছিলেন, ব্যস সেই থেকে তাকে আর পছন্দ করতে পারলো না কেউ কেউ। এটি অবশ্য গুলতেকিনের ভুলই ছিল বলবো। মৃত মানুষ যখন তার জায়গা থেকে কাউন্টার দিতে আসতে পারবে না তখন সেটি ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার মত মিনিংলেস ব্যাপারই হয়।

সেই ২০০৪ থেকে এতোগুলো বছর। লেখকের নতুন সংসারের সুখের কাহিনী আমরা পেয়েছি তার ভ্রমণ বিষয়ক বইগুলোতে। কেউ কেউ বলতো শাওন হাঁচি দিলেও হুমায়ূন আহমেদ সেটি লিখতে পছন্দ করেন। গুলতেকিন এর খোঁজ আর কেউ রাখেনি। তার একা চলার, কষ্ট ভোলার পথ কেমন ছিল কেউ জানেনি। তিনি হয়তো দুর্বল নারীর মতো ভেঙ্গে না পড়ে শক্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভালো থাকার আপ্রাণ চেষ্টা হয়তো তাকে দুঃখ জরাগ্রস্থ করেনি। কিন্তু একটা আস্ত জীবন যে এরই মাঝে পেরিয়ে গেল। পুরুষহীন শুষ্ক জীবন। ভালবাসাহীন স্মৃতির বোঝায় পিষ্ট জীবন।

এর দায় আমাদের বালখিল্য অলিখিত নিয়মে ভরা সমাজের। উন্নত দেশে এসব চলে না। একটা গোটা জীবন এরা একা কাটিয়ে বিষণ্ণতার রোগী হয় না। ভেঙ্গে যাক এসব মান্ধাতা আমলের কুটিল সমাজ ব্যবস্থা। গুলতেকিনের ৫৬ দৃষ্টান্ত হয়ে যাক সকল একা নারীর। এমনকি শাওনের জন্যও।

যে তীব্র ঘৃণা শাওন একা পেয়েছিলেন, হুমায়ূন ততটা পাননি। ভালবাসার লেখককে ঘৃণা করা যায় না।বরং লেখককে ভালবাসায় আগলে রেখে শাওন তার প্রতিও ঘৃণার বদলে ভালবাসা আজ আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু সমাজের চোখ রাঙানির ভয়ে কিম্বা কোন অজানা হিসেব নিকেশ মিলাতে শাওনেরও যেন গোটা জীবন পার হয়ে না যায় একাকিত্বে। প্রথমদিকে সকলের মতো শাওনেতে আমারও তীব্র রাগ ছিল। ঠিক ততোটাই আজ ওর একাকিত্বে মায়া জাগে।

পরিশেষে একজন আপাদমস্তক জ্ঞানীজন, অসম্ভব ভালো মনের মানুষ কবি ও লেখক আফতাব আহমেদকে শুভেচ্ছা জানানোর লোভ সামলাতে পারছি না।
ভালো থাকুন আপনি, ভালো রাখুন প্রিয় গুলতেকিনকে।




উল্লেখ্য,হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭৬ সালে গুলতেকিন খানকে বিয়ে করেন। গুলতেকিন প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর নাতনী। এই দম্পতির তিন মেয়ে এবং এক ছেলে। বড় মেয়ে নোভা আহমেদ, মেজো মেয়ে শীলা আহমেদ এবং ছোট মেয়ে বিপাশা আহমেদ। তার বড় ছেলের নাম নুহাশ আহমেদ।

News Page Below Ad

আরো পড়ুন

Error: No articles to display