সুবীর দার গান কবে প্রথম শুনি মনে করতে পারছি না। প্রথম দেখা হয়েছিল মতিঝিলে শাপলা চত্বরের পাশে সোনালী ব্যাংক ভবনে। ২০০০ বা ২০০১ সালের দিকে । চাকরি করতেন ওই ব্যাংকে তিনি। অন্যদিন-ইমপ্রেস অ্যাওয়ার্ড নামে ওই সময় বেশ নামি একটা পুরস্কারের জন্য মনোনয়নের চিঠি নিয়ে উনার সঙ্গে দেখা করি।

প্রথম দেখায় মুগ্ধ আমি, সুবীর নন্দী যে এতো ফর্সা তা বোঝা যায় না টিভিতে। পান খেতেন খুব, ঠোঁট ছিল টকটকে লাল। চিঠি পেয়ে বার বার জানতে চাইলেন, মনোনয়ন আবার কি! পুরস্কার দিবা তো? তোমাদের মাজহার সাহেবকে বলবা পুরস্কার দিলে অনুষ্ঠানে যাবো, পুরস্কার না দিলে ঘরে ফিরলে মন খারাপ হবে। পুরস্কার পাবো তো?

আমি তখন ছোট মানুষ, কে পুরস্কার পাবে না পাবে তার কি জানি! ওসব জানেন ইমপ্রেসের শাইখ সিরাজ , আর অন্যদিনের মাজহার সাহেব। তবু আন্দাজিই বলেছিলাম, অবশ্যই আপনি পাবেন।

সত্যিই ওই বছর তিনি অন্যদিন ইমপ্রেস অ্যাওয়ার্ডের সেরা গায়কের পুরস্কারটা পেয়েছিলেন। এতে উনার কাছে আমার গুরুত্ব বেড়ে গেলো। ওই যে লোকে বলে না, ঝড়ে বক মরে আর ফকিরের কেরামতি....। এরপর কতোদিন কতোবার দেখা হয়েছে, গুণে বলতে পারবো না। দূর থেকে দেখলেও এগিয়ে এসে পিঠে হালকা থাপড় দিয়ে বলতেন, অবস্থা কি রে!

বেশ কয়েকবার ইন্টারভিউ নিয়েছি সুবীর দার। শেষবার বড় সাক্ষাৎকারটা নিয়েছি, তা বোধহয় একযুগ পেরিয়ে গেছে। গ্রিন রোডের মাঝামাঝিতে গ্রিন কর্নার নামে একটা বড় ফার্মেসির (এথন আছে কিনা জানিনা) পাশের গলিতে একটা এপার্টমেন্টের তিন কি চার তালায় ছিল সুবীর নন্দীর বাসা। ওই বাসাতেই শেষবার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম কোনো একটা ম্যাগাজিনের জন্য।

একযুগ আগে তো এমন অনলাইনের ঝকমারি ছিল না যে সব প্রিজার্ভ করা যাবে। পুরোনো পত্রিকা-ম্যাগাজিন উঁইয়ে খেয়েছে। আর তখন তো সেলফি শব্দটাই আবিস্কার হয়নি। সুবীর দার সঙ্গে তাই আমার কোনো ছবি নেই। বেশিরভাগ সময় শিল্পীই তার তোলা ছবি সাংবাদিকদের দিতেন।

সুবীর নন্দীর গ্রিন রোডের ওই বাসায় অন্তত তিন-চারবার তো গেছিই। অফিস শেষ করে শিল্পীদের আস্তানায় আমরা হানা দিতাম রাতে। দাদার ওইবাসায় ঘটতো রহস্যময় ঘটনা। সুবীর দার ফ্ল্যাটে যতোদিন গেছি, খুব সম্ভবত ততোদিনই আড্ডাবাজি-গানবাজনার মাঝামাঝিতে হুট করে বিদ্যুৎ চলে যেতে দেখেছি। অটো জেনারেটর বা আইপিএস হয়তো তখন ছিল, তবে আজকের মতো এতো ছড়াছড়ি ছিল না।

বিদ্যুৎ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবারই দেখেছি, সুবীর দা কেমন অস্থীর হয়ে যেতেন। চিৎকার করতেন, অন্ধকার অন্ধকার। কই রে আলো দে আলো দে। যতোক্ষণ না কেউ চার্জলাইট বা মোমবাতি হাতে এগিয়ে আসতেন, ততোক্ষণ চেঁচামেচি চলতো। ..একটাও কাজের না, এতোক্ষণ লাগে নাকি!

গানে গানে যিনি মানুষের মনে আলো ছড়িয়েছেন, সেই শিল্পী অন্ধকারকে কেনো এতো ভয় পেতেন? ইন্টারভিউয়ে এই প্রশ্নটা সুবীরদাকে কখনো কেনো যে করা হলো না!

সুবীর দা মারা গেছেন। মৃত্যু মানে কি অন্ধকার! মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে তো আমরা অন্ধকারেই আছি। জানি না, আলোকিত মানুষ সুবীর দা সেই অন্ধকার কী করে সহ্য করছেন।

লেখক: বার্তা প্রধান, পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ [ppbd.com]