জি কে শামীম নিজে পাঁচ ফুটের কিছু বেশি, কিন্তু তাকেই ঘিরে আছে ছয় ফুটের চেয়ে বেশি বিশালদেহী সাত দেহরক্ষী, যাদের সবার হাতেই শর্টগান, পরনে বিশেষ সিকিউরিটির পোশাক। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন, সাথে যাচ্ছে তার সেই দেহরক্ষীরাও , কিসের এতো ভয়, কেন এত নিরাপত্তা বলয়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদেই সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে।
যে জিসানে হাত ধরে অপরাধ জগতে পথ চলা শুরু, সেই জিসানকে ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন সম্রাট-খালেদের সিন্ডিকেট, আর এতে করে জিসানের সাথে তৈরী হয় সম্পর্কের টানাপোড়নে, তাই জিসানের সাথে সম্পর্কের অবনতি হবার পর থেকেই দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করা শুরু করেন জি কে শামীম।
রাজধানী ঢাকার ক্লাবগুলোতে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনার সঙ্গে জড়িত যুবলীগ নেতারা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলতেন বলে জানা গেছে। অনেক রাঘববোয়ালদের পকেটে যেত ক্যাসিনোর নগদ টাকার ভাগ। বাসায় বসেই কাঁচা টাকার ভাগ পেতেন শীর্ষ নেতারা । জিজ্ঞাসাবাদে প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা এসব তথ্য দেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মাহমুদ ভূঁইয়া এবং জি কে শামীম। যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ছায়ায় কালো জগতের ডন হয়ে ওঠেন তারা। একপর্যায়ে তারা অপরাধ জগতের নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন দুবাইয়ে অবস্থানকারী শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে। এরই একপর্যায়ে খালেদ-শামীমকে শেষ করে দিতে দুবাই থেকে ঢাকায় একে-২২ এর একটি চালান পাঠান জিসান। গোয়েন্দা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ঢাকার অপরাধ জগতের ভাড়াটে কিলার, চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের সঙ্গে গভীর সখ্য ছিল যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া এবং জি কে শামীমের। টাকার ভাগবাটোয়ারা এবং অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র করে দুবাইয়ে অবস্থানকারী শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তারা। এই দ্বন্দ্ব নিরসনে কয়েক মাস আগে দুবাইতে জিসানের সঙ্গে খালেদ ও শামীমের বৈঠক হয়। তবে বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি।
পরে খালেদ ও শামীমকে হত্যা করতে পরিকল্পনা করে জিসান। মিশন বাস্তবায়ন করতে একে-২২ এর একটি অস্ত্রের চালানও ঢাকায় পাঠায় জিসান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, রাজধানীর গুলশান, বনানী, বাড্ডা, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের আধিপত্য রয়েছে। দুবাইতে বসেই ঢাকার অপরাধ জগতে সে আধিপত্য বিস্তার করছে। এমনকি টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণেও তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। জিসান অনেক বছর ধরেই দুবাইতে অবস্থান করছেন।
গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রটি জানায়, ২৬ জুলাই রাতে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার একটি বাসা থেকে একে-২২ এবং গুলিসহ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়েন জিসানের দুই সহযোগী। পরে তারা ডিবির কাছে পুরো ঘটনা বর্ণনা করেন।
এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, জিসানের সাপোর্ট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডার, চাঁদা এবং ঠিকাদারি ব্যবসা করছেন শামীম। এরই মধ্যে যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট ও খালেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। এরপর জিসানকে বাদ দিয়ে সম্রাট ও খালেদের সহায়তায় ঠিকাদারি ব্যবসা করেন শামীম। এ নিয়ে জিসান এই সিন্ডিকেটের ওপর ক্ষুব্ধ হয়।
খবর পেয়ে জিসানের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রাখেন শামীম। কোনো ইস্যুতে সম্প্রতি খালেদের সঙ্গেও জিসানের সম্পর্কের অবনতি হয়।
একাধিক সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মতিঝিল পল্টন এলাকার ক্লাবপাড়ার ক্যাসিনোতে জুয়াড়িদের পাশাপাশি অপরাধ জগতের লোকজনের আনাগোনাও ছিল। সেখানে পেশাদার কিলার, সন্ত্রাসী এবং চাঁদাবাজদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে খুনের পরিকল্পনাও হতো সেখানে। এরই অংশ হিসেবে জিসান, সম্রাট, খালেদ, জি কে শামীমের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়।
শুক্রবার সাত দেহরক্ষীসহ গ্রেফতারের পর র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে শামীম বলেছেন, আগে তার এত দেহরক্ষী ছিল না। দুবাইয়ে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ভয়ে তিনি সাতজন দেহরক্ষী নিয়োগ দিয়েছেন। জিসানের নামে এক সময় সরকারি বিভিন্ন দফতরের ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন জি কে শামীম। বিভিন্ন ব্যবসায় এ দু’জনের অংশীদারিত্বও ছিল। তবে শামীম যুবলীগের সিন্ডিকেটে যুক্ত হওয়ার পর জিসানের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়।
টেন্ডারবাজি এবং চাঁদাবাজি এবং অস্ত্রবাজির অভিযোগে গত শুক্রবার গুলশানের নিকেতনের বাসা থেকে জি কে শামীমকে গ্রেফতার করা হয়। জি কে শামীমের সাথে তার সেই সুঠাম দেহী দেহরক্ষীদেরও গ্রেফতার করা হয়।