একটা দেশের প্রশাসনিক কাঠামো কতটা ভেঙ্গে পড়লে দেশের প্রশাসনের প্রানকেন্দ্র খোদ সচিবালয়ে চাকুরীদাতা প্রতারকচক্রের সিন্ডিকেট তাদের কার্যকর্ম নির্বিগ্ন চালিয়ে যেতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী সচিবালয়ের ভেতর যদি এহেন কান্ড হতে পারে, তাহলে দেশের অন্যন্য অঞ্চলে প্রশাসন কিভাবে চলছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না ।



এ সিন্ডিকেটে বহিরাগত দালাল ছাড়াও এ চক্রে জড়িত সচিবালয়েই কর্মরত চতুর্থ শ্রেণির কিছু কর্মচারী। অফিসের সময় শেষ হয়ে গেলে যখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সচিবালয় ছাড়েন, তখন তাদেরই কক্ষে শুরু হয় প্রতারকদের ’অফিস’!




পোশাক-পরিচ্ছদ পরিবর্তন করে এসব প্রতারকের কেউ বনে যান সচিব-উপসচিব; কেউবা তাদের পিএ। কখনো উপ-সচিবের কক্ষে, কখনো যুগ্ম সচিবের কক্ষে- কর্মকর্তাদের চেয়ারে বসেই প্রতারকরা চাকরিপ্রার্থীদের ইন্টারভিউ নেওয়ার নামে নাটক করছেন এবং বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি দেওয়ার নাম করে হাতিয়ে নিচ্ছেন মাথাপিছু ১০ লাখ থেকে ১৮ লাখ টাকা। বছরের পর বছর ধরে চলছে এহেন নাটক। এটি প্রতারণাই শুধু নয়, প্রশ্নবিদ্ধ করছে দেশের প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও।

সংঘবদ্ধ এ প্রতারকচক্রের সদস্যরা চাতুর্যের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন দপ্তরের প্যাডে সংশ্লিষ্ট উপসচিবের স্বাক্ষর জাল করে প্রকৃত নিয়োগপত্রের মতো হুবহু অথচ ভুয়া নিয়োগপত্র তুলে দিচ্ছে চাকরিপ্রত্যাশীদের হাতে। স্মারক নম্বরে বসিয়ে দিচ্ছেন ’অফিস আদেশ’।

চাকরির পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ’একমাত্র রাষ্ট্রীয় কার্যে ব্যবহার্য’ লেখা সরকারি খামে সচিবের নামে তারা ভুয়া সেই নিয়োগপত্র দিচ্ছেন ভুক্তভোগীদের। শুধু তাই নয়, মোটা টাকা গ্রহণ করার পর মাসের পর মাস ঘুরেও যখন চাকরিপ্রত্যাশীরা দপ্তর বুঝে পান না, তখন গা বাঁচাতে তাদের হাতে ট্রেনিং পিরিয়ডের নামে দু-এক মাসের বেতনও তুলে দেওয়া হচ্ছে।

সচিবালয়ে চাকরিদাতা প্রতারকচক্রের হাতে প্রতারিত ২৫ ভুক্তভোগীর নামের একটি তালিকা ছাড়াও এক উপসচিবের কক্ষে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চেয়ারে বসে চাকরিপ্রার্থীদের ইন্টারভিউ নেওয়ার ভিডিও ফুটেজ, উপসচিবের জাল স্বাক্ষরিত একাধিক নিয়োগপত্রসহ এ সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ রয়েছে ।

এমন এক চক্রের বিরুদ্ধে গত ৩ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় মামলা (নম্বর-১৩) করেছেন একেএম মোসলেহ উদ্দিন নামে প্রতারণার শিকার একজন। মামলায় আসামি করা হয়েছে সচিবালয়ে কর্মরত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. শফিকুল ইসলাম (ফরাশ শাখা- সকালে অফিসের তালা খোলা এবং বিকালে তালাবদ্ধ করার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারী), কেএম মোর্তুজা আলী রনি এবং তাদের সহযোগী দালাল মো. শাহিনুল কাদির সুমন ওরফে পালসার সুমনকে।

আসামি সুমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চাঁদাবাজির সঙ্গেও জড়িত বলে জানা গেছে। অভিযোগ- অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিবের (প্রশাসন) স্বাক্ষর জাল করে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার্য খামে চাকরির ভুয়া নিয়োগপত্র প্রদানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সংঘবদ্ধ এই প্রতারকচক্র। গত ২ আগস্ট চক্রের সদস্য পালসার সুমনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৪।

মামলার পর থেকে পলাতক মোর্তুজা আলী রনি। তবে পালের গোদা শফিকুল ইসলাম এখনো আছেন বহালতবিয়তে। যার অধীনে কর্মরত শফিকুল, সেই কেয়ারটেকার ইনচার্জ মাহমুদুর রহমান জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার বিকালেও অফিস করেছেন শফিকুল। সেদিন মাহমুদুর রহমান জানান, শফিকুল ইসলাম সচিবালয়ে ফরাশ হিসেবে (স্থায়ী) কর্মরত। কিছুদিন অসুস্থ থাকলেও এখন যথানিয়মেই অফিস করছেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তফা কামাল বলেন, কেয়ারটেকার ডিপার্টমেন্টে কর্মরত কোনো কর্মচারী চাকরি দেওয়ার নামে সচিবালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তার কক্ষে ঢুকে, তাদের চেয়ারে বসে প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে আমি অবগত নই। বিষয়টি খতিয়ে দেখব। সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুমন ও তার তিন সহযোগীর বিরুদ্ধে গত বৃহস্পতিবার মাগুরার সদর আমলি (ক) আদালতেও একটি মামলা হয়েছে। মামলাটি করেছেন জনৈক শাখাওয়াত হোসেন। বাদীর অভিযোগ, তার ছেলেসহ ৮ জনকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে অফিস সহকারী ও অফিস সহায়ক পদে চাকরি দেওয়ার নাম করে এ সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে ৭৯ লাখ টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক উপসচিবের স্বাক্ষর জাল করে হুবহু নিয়োগপত্রের আদলে তাদেরও দেওয়া হয়েছিল ভুয়া ’নিয়োগপত্র’।

গতকাল বুধবার শাখাওয়াত বলেন, সুমন এই ৮ জনকে কয়েক দফায় সচিবালয়ে নিয়ে যান। তবে তিনি ভেতরে যেতেন না। মোবাইল ফোনে ভেতর থেকে ডেকে আনা তার সহযোগীরাই চাকরিপ্রত্যাশীদের ভেতরে নিয়ে যেতেন।

কখনো ৩ নম্বর ভবনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিবের কক্ষে, কখনো যুগ্ম সচিবের কক্ষে নিয়ে তাদের চাকরির ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। ইন্টারভিউ নিতেন শফিকুল ইসলাম। প্রথমে তিনি নিজেকে সচিব বলে পরিচয় দেন। একপর্যায়ে জানান তিনি সচিবের পিএ। অনেক পরে জানতে পারি, শফিকুল সচিবও না, তার পিএ-ও না।

তিনি হলেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। ছেলে চাকরি পাবে আশায় জমিজমা বিক্রি ও ধারদেনা করে সুমন ও তার সহযোগীদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম টাকা। পরে দেখি পুরো চক্রটিই ভুয়া। সচিবালয়ে বসে এমন অপকর্ম করলে নিরাপত্তা কোথায়? আমরা কোথায় যাব? এ চক্রকে গ্রেপ্তার করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন শাখাওয়াত হোসেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপসচিব ও তার পিএ সেজে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী শফিকুল ইসলাম ও কেএম মোর্তুজা আলী রনিসহ কয়েকজন যে কক্ষটিতে চাকরিপ্রত্যাশীদের ইন্টারভিউ নিয়েছেন, সেই কক্ষটি (২৪২ নম্বর) সচিবালয়ের ৩ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত।

এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মো. জেহাদ উদ্দিন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সুলতান আহমেদ খানের কক্ষ। ওই কক্ষে সুলতান আহমেদ খানের চেয়ারে বসে উপসচিব সেজে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী শফিকুল ইসলাম চাকরিপ্রত্যাশীদের যে ইন্টারভিউ নিয়েছেন, সেসব কা-ের ভিডিও ফুটেজ এবং ভুয়া নিয়োগপত্র দেখে প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ খান বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, এও কি সম্ভব?!

গত মঙ্গলবার বিকালে তিনি প্রসঙ্গে বলেন, ফরাশদের কাজ হলো সকালে কর্মকর্তারা আসার আগে অফিসের তালা খুলে দেওয়া; বিকালে অফিস ত্যাগ করার পর তালা লাগিয়ে দেওয়া। কর্মকর্তার চেয়ারে বসা তো দূরে থাক, টেবিলের কোনো কাগজে হাত দেওয়ার অনুমতি পর্যন্ত নেই তাদের।

অথচ আমার চেয়ারে বসে দিনের পর দিন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে, তা কারোরই নজরে এলো না? আমরা অফিস শেষে দরজা লক করে চলে যাই। এর পরও ফরাশ পদের কেউ যদি দরজা খুলে এ ধরনের গর্হিত অপরাধ করে, তা হলে বিষয়টি অবশ্যই অ্যালার্মিং (ভীতিকর)। এটি শক্তভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের উপসচিব মো. হেলাল উদ্দিনের স্বাক্ষর জাল করে চক্রটি অনেককে নিয়োগপত্র দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, কিছু অসাধু কর্মচারীর বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নাম করে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে আমি জানতে পেরেছি।

অভিযোগগুলো ২০১৭ সালের। সে সময় আমি এ দপ্তরে ছিলাম না। থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অভিযোগের বিষয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তবে সচিবালয়ে বসে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষে ঢুকে, তাদের চেয়ারে বসে চাকরিপ্রার্থীদের ইন্টারভিউ নেওয়া বোধ করি অসম্ভব।

এমন মন্তব্যের পর এ কর্মকর্তাকে ইন্টারভিউ নেওয়ার ভিডিও ফুটেজ দেখানো হলে তিনি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর বিষয়টি অবিশ্বাস্য আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, শিগগির এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অবগত করা হবে।

মিরপুর মডেল থানায় চাকরিপ্রাপ্তির নামে প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী মোসলেহ উদ্দিনের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রাসেল বলেন, চাকরি প্রদানের নামে প্রতারণাকারী চক্রের একাধিক সদস্য সচিবালয়ে কর্মরত বলে তদন্তে জানতে পেরেছি।

যেহেতু তারা সরকারি কর্মচারী, তাই তাদের জিজ্ঞাসাবাদে কিছু বিধি রয়েছে। সেসব মেনেই তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। শাহিনুল কাদির সুমন (পালসার সুমন) নামে গ্রেপ্তার একজন বর্তমানে কারাগারে। অন্যদেরও স্বল্পতম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

বাদী মোসলেহ উদ্দিন জানান, তার ছোট বোন নূরুন্নাহার ইডেন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরির চেষ্টা করছিলেন। ২০১৬ সালের শেষদিকে আসামি সুমনের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে বোনের চাকরি নিয়ে আলোচনা করেন মোসলেহ উদ্দিন।

সে সময় সুমন জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবের পিএ কেএম মোর্তুজা আলী রনির সঙ্গে তার পরিচয় আছে। তার সঙ্গে কথা বলে নূরুন্নাহারকেই শুধু নয়, আরও অনেককে চাকরি দেওয়া সম্ভব।

মোসলেহ উদ্দিন বলেন, এর পর আমি আমার গ্রামের প্রতিবেশী মো. শরিফুল ইসলামকে এ বিষয়ে শেয়ার করলে তিনিও চাকরিপ্রাপ্তির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিষয়টি সুমনকে জানাই।

তিনি বলেন, নূরুন্নাহারকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সহকারী এবং শরিফুলকে অফিস সহকারী পদে চাকরি প্রদান করা সম্ভব। একান্ত সহকারী পদের বিপরীতে ১৫ লাখ এবং অফিস সহকারীর বিপরীতে ১২ লাখ টাকা দাবি করেন সুমন।

পরে একান্ত সহকারী পদের জন্য ১৪ লাখ, অফিস সহকারীর জন্য ১১ লাখ টাকা চূড়ান্ত হয়। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ টাকা অগ্রিম দিতে হবে এবং ২০ শতাংশ টাকা নিয়োগপত্রপ্রাপ্তির পর হাতে হাতে পরিশোধ করতে হবে মর্মে পরস্পরের আলোচনাসাপেক্ষে সিদ্ধান্ত হয়।

সুমন জানান, প্রাথমিকভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় মৌখিক পরীক্ষা ও লিখিত পরীক্ষা নেবেন। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয়ের নিয়োগসংক্রান্ত কমিটি প্রার্থীদের চূড়ান্ত নিয়োগ দেবেন।

কথামতো ২০১৭ সালে কয়েক দফায় সচিবালয়ের ভেতরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক উপসচিবের কক্ষে ওই দুজনের ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। এর পর প্রতারকচক্রের কথামতো ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর সুমন ও তার দুই সহযোগীকে ১০ লাখ টাকা দেন মোসলেহ উদ্দিন।

এক সপ্তাহ পরে সুমন মোবাইল ফোনে জানান, ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। যথাদিনে নূরুন্নাহার ও শরিফুল ইসলাম অর্থ মন্ত্রণালয়ে যান। সেদিন ফরাশ শফিকুল ইসলাম অর্থ সচিবের বেশে তার অফিসকক্ষে তারই চেয়ারে বসে দুজনের মৌখিক পরীক্ষা নেন। পরদিন মোবাইল ফোনে সুমন জানান মৌখিক পরীক্ষায় তাদের উত্তীর্ণ হওয়ার কথা।

বলেন যে, শিগগিরই তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হবে। তাই আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্রুত অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে বলেন। ২০১৭ সালের ১৯ জানুয়ারি সুমন ও কেএম মোর্তুজা আলী রনির হাতে ১০ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়। একদিন পর ফের সুমন ফোন করে মোসলেহ উদ্দিনের কাছে আরও টাকা দাবি করেন।

সেই মোতাবেক সুমনের ব্র্যাক ব্যাংকের ১৫০৯২০০৮১৫২২৪০০১ নম্বর হিসাবে ২২ ও ২৩ জানুয়ারি ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরবর্তী ৬ মার্চ মোসলেহ উদ্দিন তার ইবিএল হিসাব নং ১০৯১০১০০০৯৭৪২ থেকে অনলাইনে সুমনের ব্র্যাক ব্যাংকের হিসাব নম্বরে ফের ২ লাখ টাকা দেন। এভাবে বিভিন্ন সময়ে তাকে মোট ২৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

মোসলেহ উদ্দিন আরও জানান, ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি শরিফুল ইসলামকে একটি এবং ২০ মার্চ ও ৬ এপ্রিল আমার বোনকে ২টি নিয়োগপত্রসহ ৩টি নিয়োগপত্র দেওয়া হয়।

পত্রগুলো ছিল সরকারি খামের ভেতর। খামের ওপরে এসই-৫, একমাত্র বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় কার্যে ব্যবহার্য লেখা ছিল। সচিবালয়ের সামনেই প্রার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. হেলাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত পত্রগুলো।

ভুক্তভোগী মোসলেহ উদ্দিন বলেন, এর পর আমার বোন ও শরিফুল ইসলামকে সুমন ও রনি অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিয়ে যান এবং চাকরিতে যোগদানের কথা বলে তাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট নেন, ওপেন করেন সার্ভিস বুক। এর পর আসামিরা জানান, ক’দিনের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন হবে, এর পরই তাদের অফিস করতে হবে।

আপাতত অফিসে না এলেও চলবে। রনি ২০১৭ সালের ৫ জুলাই আমার বোন ও শরিফুলকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অফিসে ডেকে নিয়ে এক মাসের বেতন বাবদ আমার বোনকে ৩১ হাজার ৫০০ টাকা এবং শরিফুলকে ১৩ হাজার ৮০০ টাকা দেন। তখন আমরা ধারণা করি যে, আমার বোন ও শরিফুলের চাকরি নিশ্চিত।

কিন্তু কয়েক মাস যাওয়ার পরও পুলিশ ভেরিফিকেশন না হওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন করলে সুমন জানান, কিছুদিন পর ভেরিফিকেশন হবে। তখন আমাকে ২৩ জনের নাম লেখা একটি তালিকা দিয়ে তিনি বলেন, তালিকার এসব লোককে তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চাকরি দিয়েছেন।

অন্যদিকে ২০১৭ পেরিয়ে ২০১৮ সাল শেষ হয়ে গেলেও পুলিশ ভেরিফিকেশন না হওয়ায় আমাদের সন্দেহ হয়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, মোর্তুজা রনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সহকারী পদের পরিচয় দিলেও তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা নন; মাস্টার রোলে কর্মরত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মাত্র। আসামি শফিকুল ইসলামও প্রতারক। তিনি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রুহুল আমিন পরিচয় দিয়ে তিনি প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নিয়েছিলেন।

শফিকুল ইসলাম সচিবের পরিচয়ে তার চেয়ারে বসে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার সময় গোপনে মোবাইল ফোনে ধারণকৃত একটি ভিডিও আমার হাতে আসে এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে। তখন বুঝতে পারি যে, আমরা প্রতারকচক্রের খপ্পরে পড়েছি।

পরে সুমনকে টাকা ফেরত দেওয়ার চাপ দিলে তিনি দেই-দিচ্ছি শুরু করে দিনের পর দিন সময় ক্ষেপণ করতে থাকেন। উপায়ান্তর না পেয়ে শেষে আমি র‌্যাব ৪-এর অধিনায়কের কাছে পুরো বিষয়টি খুলে বলি। ২ আগস্ট সকালে মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৪। এর পরই রনি গা ঢাকা দিয়েছে।







মোসলেহ উদ্দিন বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, আমার মামলার অন্যতম আসামি সচিবালয়ের ফরাশ পদে কর্মরত শফিকুল ইসলাম এখনো দিব্যি অফিস করছেন। তিনি বলেন, মামলা তুলে নিতে আমাকে এখন নানাভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

নয়তো মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গত কারণেই আমি গত ৭ আগস্ট মিরপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৩৫৫) করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ প্রতারকচক্রকে আইনের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।