এক বীরের চলে যাওয়া। জঙ্গি বিরোধী অভিযানে এরকম লড়াকু বীর খুব কমই জন্মেছেন এই দেশে। যেমনটি জন্মেছিলেন কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ। বিডিআর বিদ্রোহে তার চলে যাওয়াটিও ছিল এমন বেদনাদায়ক। কর্নেল গুলজারের এমনই এক উত্তরসূরী ছিলেন লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদ। ২৫ মার্চ সিলেটের শিববাড়ীতে জঙ্গিদের বোমা বিস্ফোরণে আহত হওয়ার পর রাষ্ট্র তাকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।
কিন্তু এসব চেষ্টা ব্যর্থ করে গত বৃহস্পতিবার রাত ১২ টা ৫ মিনিটে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের আইসিইউতে তার হূদস্পন্দন থেমে যায়। স্ত্রী হলো স্বামী হারা। তিন সন্তান তাদের বাবাকে হারাল। আর দেশ হারাল জঙ্গি বিরোধী অভিযানে দক্ষ, চৌকস ও লড়াকু সৈনিককে। ১২৫ ঘণ্টা পাঞ্জা লড়ে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিলেন।
একজন ভালো মানুষ ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক ছিলেন আজাদ। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নিরলস কাজ করে গেছেন। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও অভিযানের ক্ষেত্রে চৌকস ভূমিকা পালন করতেন তিনি। একদিকে প্রচারবিমুখ আজাদ আবার কৌশলগত কারণেও গণমাধ্যমের সামনে কম আসতেন। কিন্তু গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের কর্মীরা ছিল তার খুব প্রিয়।
আবুল কালাম আজাদ একজন পরহেজগার মানুষ ছিলেন। নিয়মিত নামাজ আদায়ের চেষ্টা করতেন। অফিসে নামাজ আদায়ের সময় উচ্চস্বরে সুরা-কিরাত পড়তেন। উচ্চস্বরে পড়ার কারণ জানতে চাইলে বলেছিলেন, এতে নামাজে তার মনোযোগ সৃষ্টি হতো। ৬ মার্চ রাতে রাজধানীর বনানী এলাকায় সামরিক কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা আশালতার বাসভবনে গেলে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এক জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় লে. কর্নেল আজাদের । প্রায় ২০ মিনিটের আলাপচারিতায় ছিল ব্যক্তিগত কথা। আবার কথা প্রসঙ্গে বাহিনী, বাহিনী প্রধান, বাহিনীর কর্মকাণ্ডের দিক আসে আলোচনায়। এক পর্যায় লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন, ’দেশের জন্য মৃত্যুকে ভয় করি না, তবে পেশাদারিত্ব আর সম্মান নিয়ে চলতে চাই।’
পারিবারিক ও ব্যক্তিগত আলাপচারিতা শেষে কথা প্রসঙ্গে আবুল কালাম আজাদ বলেছিলেন, ’র‌্যাব আরো উচ্চতায় যাবে। কিছু লোকবল আরো দরকার। বিশেষ করে ডিজি স্যার (র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ) খুবই আন্তরিক মানুষ। ডিজি স্যার খুব ভালো মানুষ। আমাকে খুব স্নেহ করেন। ওই রাতে তিনি আরো বলেন, আমি বিজিবিতে চলে যাচ্ছি। ওখানে গিয়েও ভালো কাজ করব। তবে র‌্যাবে আরো কিছুদিন কাজ করার ইচ্ছে ছিল এমন এক ধরনের মনোভাব ব্যক্ত করে বলেন, অনেক দিন তো ছিলাম। কাজ করে গেছি, আমি কাজ ভালোবাসি।
র‌্যাবের কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদের মুখ থেকে সে রাতে বেরিয়ে আসে সম্ভাব্য কয়েকটি হামলার কথা। কথা বলার একপর্যায়ে তিনি বলেন, ’আমরা বহু হামলা ঠেকিয়েছি। র‌্যাব যত হামলা ঠেকিয়েছে এগুলো তো মিডিয়ায় আসে না। ডিজি মহোদয় নিজেই সবকিছু ফলোআপ করতেন। কোনো কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ফলোআপ করেই যেতেন। কথা বলার সময় আজাদ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সামাজিক মাধ্যমে জঙ্গিরা বিদেশে যোগাযোগ করছে। এদের শেকড়ে আঘাত করতে হবে।
এ সময় তিনি একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করে বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলটি জঙ্গিবাদের নেপথ্যে কাজ করছে। যত ঘটনার নেপথ্যে তারাই। তবে সরকার জঙ্গি নির্মূলে কঠোর। আমরা সবসময় নজরদারি করে যাচ্ছি। তারপরও হামলার পরিকল্পনা করছে কেউ কেউ। কিন্তু জঙ্গিরা বেশি দিন আর টিকতে পারবে না। তাদের শেষ করেই ছাড়ব।’
আলাপের শেষ অংশে তিনি বলেন, ভালো কাজ করে গেলে সুনাম হয়। আমি যত দিন র‌্যাবে আছি একটা মানুষের ক্ষতি করি নাই। চলে যাচ্ছি কেউ বলতে পারবে না কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছি। তবে পেশা ও কাজের কারণে রাগ করেছি। এটুকুই…। কারো ক্ষতি করার চিন্তাও ছিল না। আমি ভাই ধর্মভীরু মানুষ। আমার খুব বেশি দরকার নেই। বেতন-ভাতা, বোনাস, সরকারি সুযোগ সুবিধে যা পাই তা দিয়েই শুকরিয়া। জাগোনিউজ