নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত নূর হোসেনের হয়ে আইনি লড়াই চালিয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা। নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথা সবারই জানা।
চাঞ্চল্যকর মামলাটির প্রধান আসামি নূর হোসেনের মুক্তির দাবিতে মিছিল করতেও দেখা গেছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের। নূর হোসেনের মতো র‌্যাবের চাকরিচ্যুত আসামিদের পক্ষেও ছিলেন আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ আইনজীবীরা।
মামলায় রায় ঘোষণার সময় বেশ বিমর্ষ দেখাচ্ছিলো নূর হোসেনের পক্ষের আইনজীবীদের। তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে আওয়ামী লীগ সমর্থক অন্য আইনজীবীদের পাশাপাশি জেলা আইনজীবী সমিতির নেতাদের দেখা গেছে আনন্দ মিছিল করতে। এই সমিতির ১৭টি পদের মধ্যে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ৯ জনই আওয়ামী লীগ পন্থী।
মামলায় নূর হোসেনের পক্ষে খোকন সাহা, তারেক সাঈদের হয়ে অ্যাডভোকেট সুলতানুজ্জামান আর আরিফ হোসেনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন আড়াইহাজার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ ভূঁইয়া। মামলা চলার সময় পাবলিক প্রসিকিউটরের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে দেখা গেছে আসামী পক্ষের আইনজীবীদের।
গত বছরের ৩ মার্চ একটি মামলার বাদী ও নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটিকে কড়া সুরে জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা। ওই সময় নূর হোসেনসহ কয়েকজনকে নিঃশব্দে হাসতে দেখা যায়। সেদিন খোকন সাহাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বিউটি বলেন, ‘একজন আইনজীবী মারা গেছেন। তাকে খুন করা হয়েছে। আর আপনি একজন আইনজীবী হয়ে কিভাবে এ মামলা করছেন? আপনি তো আপনার সহকর্মী আর ভাইয়ের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করছেন। সাত খুনের পর আপনি আমার বাসায় গিয়ে বলেছেন, সহায়তা করবেন। অথচ এখন আসামীদের পক্ষে কাজ করছেন।’
জবাবে খোকন সাহা বলেন, ‘আমি এখন একজন আইনজীবী হিসাবে মামলায় সহায়তা করছি। এখন আমি একজন আইনজীবী।’
সেদিন বিউটিকে অ্যাডভোকেট আব্দুর রশিদ জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি দেখেছেন, নূর হোসেন আপনার স্বামীসহ ৭ জনকে অপহরণ করেছেন?’
উত্তরে বিউটি বলেন, ‘আমি যদি দেখতাম, তাহলে কি আর আমার স্বামীকে মারতে পারতো। আপনি একজন আইনজীবী। যদি আজ আপনার বোন এভাবে স্বামীহারা হতো, তাহলে আপনার কেমন লাগতো? সাতটি পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেলো, অথচ আপনারা আসামিদের সহায়তা করছেন।’
রায় ঘোষণার পর নূর হোসেনের বরাত দিয়ে খোকন সাহা বলেন, নূর হোসেন বলেছেন যে আমি ন্যায়বিচার পাইনি। আমি এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট না। রায়ের বিরুদ্ধে অচিরেই উচ্চ আদালতে আপিল করবো। আশা করি, উচ্চ আদালতে আমরা ন্যায়বিচার পাবো।
তিনি আরো বলেন, আমি, অ্যাডভোকেট সুলতানুজ্জামান ও আব্দুর রশিদ পেশাদার আইনজীবী। আইনকে নিজস্ব গতিতে চলার জন্য আমরা এই মামলায় আসামিদের পক্ষে ছিলাম। আমরা স্বাধীনতার পর থেকে অর্ধশতাধিক মামলার শুনানি করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি, এই ধরনের চাঞ্চল্যকর মামলায় শুনানি করার মতো যোগ্যতা সম্পন্ন আইনজীবী নারায়ণগঞ্জে রয়েছে। আসামিরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকলে উচ্চ আদালতে আপিল এবং লিভ টু আপিল করতে পারবেন।
অ্যাডভোকেট সুলতানুজ্জামান ও আবদুর রশিদ ভূঁইয়াও রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের কথা বলেন।
সাত খুনের ঘটনায় নূর হোসেনকে সোর্স হিসাবে ব্যবহার করার তথ্য র‌্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। একটি ভিডিওতে নূর হোসেনকে বলতে দেখা যায়, ‘ঘটনার দিন আমি শহর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি খোকন সাহাকে ফোন করে বলেছিলাম, ‘দাদা কেমন আছেন?’ দাদাও আমি কেমন আছি তা জানতে চান। পরে আমি জিজ্ঞেস করি, ‘দাদা, কোর্টে কি নজরুল এসেছে?’ তখন দাদা বলেন, ‘হ্যাঁ, কোর্টে তো নজরুল এসেছে।’
নিউজবিডি৭১