বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা এবং নাট্যনির্দেশক তারিক আনাম খান। মঞ্চ, টেলিভিশন আর চলচ্চিত্র সব খানেই তাঁর সরব উপস্থিতি। ট্রিমড করা ’ট্রেড মার্ক’ শ্মশ্রুমণ্ডিত চেহারা তাঁকে দিয়েছে অনেক জনপ্রিয়তা। পারিবারিক আবহের কারণেই তারিক আনাম খান সংস্কৃতি জগতে প্রবেশ করার ব্যাপারে অনুপ্রেরণা পান। সাতক্ষীরায় অসাম্প্রদায়িক পরিবেশও তাকে প্রভাবিত করে। তাছাড়া কলকাতা নিকটের শহর হওয়ার কারণে তিনি বইপত্র, নাটক ইত্যাদির সংস্পর্শে ছিলেন। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হওয়ার কারণে তিনি পাইলট বা ইঞ্জিনিয়ার হবেন এরকম আশা করেছিলেন। স্বাধীনতার সময়ে তিনি নয় নাম্বার সেক্টরের বিভিন্ন ক্যাম্পে নাটক করেছেন। এ সময়েই নাটকের প্রতি তার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে তিনি সরকারী বৃত্তি পেয়ে দিল্লী ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে গমন করেন। দিল্লীতে পড়াশোনাই তাকে অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। দিল্লীতে পড়াশোনা শেষ করে আসার পর তারিক আনাম খান কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এর মাঝে ঘুড্ডি, লাল সবুজের পালা, সুরুজ মিয়া অন্যতম। বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারার কারণেই তিনি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র থেকে একটু দুরত্ব বজায় রেখেছেন এবং বেছে বেছে কাজ করেছেন। তিনি চলচ্চিত্রের তুলনায় মঞ্চকে বেশি পছন্দ করেন বলে জানিয়েছেন। তাছাড়া বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং বিজ্ঞাপন নির্মানে জড়িয়ে পড়ার কারণেও তিনি চলচ্চিত্র থেকে দূরে থেকেছেন। ১৯৯০ সালের ১১ অক্টোবর তিনি তার নাটকের প্রতিষ্ঠান নাট্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। তারিক আনাম বেশ ফ্যাশন সচেতন। তিনি নিয়মিত হাতে ঘড়ি পরেন এবং তার ট্রেন্ডি ঘড়ি পড়তে ভালো লাগে। রোলেক্স ও টাইটানের ঘড়ি পরেন তিনি। পোশাকে তার আলাদা করে কোনো রঙের প্রতি দুর্বলতা নেই। সব রংই ভালো লাগে। তবে শার্টের ভেতরে চেক বেশি পছন্দ করেন।

ঈদ উপলক্ষে তার অভিনীত দুটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। সিনেমা দুটি হলো অনন্য মামুনের ’আবার বসন্ত’ ও সাকিব সনেট পরিচালিত ’নোলক’। দুটি সিনেমা থেকেই বেশ সাড়া পাচ্ছেন এই অভিনেতা। বিশেষ করে ’আবার বসন্ত’ সিনেমাটি তরুণ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এই সিনেমায় তার ভিন্ন ধরনের উপস্থিতি দারুণ প্রশংসিত হচ্ছে। সিনেমা দুটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ’আবার বসন্ত’ ছবির গল্প একেবারেই অন্যরকম। এই ধরনের গল্প নিয়ে আমাদের দেশে এর আগে কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না।
এখানে আমার সঙ্গে জুটি বেঁধেছে স্পর্শিয়া। আমাদের দুজনের বয়সে অনেক ব্যবধান। কিন্তু গল্পের প্রয়োজনে আমরা দুজনেই স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করেছি।

আমরা যে ভালো ছবির খরায় ভুগি সেটার চাহিদা এ ছবি মেটাবে বলেই আমার বিশ্বাস। অন্যদিকে ’নোলক’ পুরোপুরি বাণিজ্যিক ঘরানার ছবি। দুটি ছবি দেখেই দর্শক বাহবা দিচ্ছেন। ঈদ ছাড়া অন্য সময় ছবি মুক্তি পেলে সফলতা পায় না। এর কারণ কী? এই প্রসঙ্গে তারিক আনাম বলেন, এটা আসলে বিশদ আকারে বলার বিষয়। সংক্ষেপে বলতে পারি, ঈদে মানুষের ছুটি থাকে। আলাদা আনন্দ থাকে। উদ্যাপনের বিষয় থাকে। এসব কারণে ঈদে ছবি দেখাটাও অনেকের কাছে উৎসবের অংশ। ঈদের ছবির প্রতি নির্মাতাদেরও সতর্কতা থাকে একটু বেশি। অন্য সময়ও এ সচেতনতা বাড়াতে হবে। দর্শক হৃদয় স্পর্শ করার মতো গল্প নিয়ে কাজ করতে হবে।

এছাড়া গেল কয়েক বছর ধরে আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থা ভালো না। বছরের অন্য সময়গুলোতে যেসব ছবি মুক্তি পাচ্ছে সেগুলো বিভিন্ন কারণে দর্শকের মনে দাগ কাটে না। ঈদের মতো বছরের অন্য সময়েও যদি ভালো গল্পের ছবি মুক্তি দেওয়া হয় তাহলে দর্শক সিনেমা হলে ফিরে আসবে বলে আমি মনে করি। এদিকে এই অভিনেতার আরও দুটি ছবি মুক্তির অপেক্ষায় আছে বলে জানান। ছবি দুটি হলো নুরুল আলম আতিকের ’পেয়ারা সুভাস’ ও অন্যটি রাজা চন্দের ’বেপরোয়া’। ছবি দুটি এ বছর মুক্তি দেয়ার কথা রয়েছে। নতুন চলচ্চিত্রের খবর জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামী ৪ঠা জুলাই থেকে নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুলের একটি ছবির শুটিং শুরু করবো। ছবিটি আমাদের মাননীয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ হচ্ছে। আশা করছি এই ছবিতে ভালো কিছু হবে।

এদিকে ঈদে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ছোট পর্দায়ও উপস্থিতি ছিল এই অভিনেতার। আফজাল হোসেনের ’ছোট কাকু’ সিরিজে অভিনয় করেছেন তিনি। ছোট পর্দার এখনকার অবস্থা সম্পর্কে এ অভিনতা বলেন, এই সময়ের টিভি নাটকে বাবা-মা থেকে শুরু করে অনেক চরিত্র হারিয়ে গেছে। গল্পেরও বেশ সংকট। মোটকথা, ছোট পর্দায় এখন আগের মতো ভালো কাজ হচ্ছে না। ভারতীয় সিরিয়াল দর্শক কেন দেখে? এটির কারণ হলো তাদের সিরিয়ালে একটা পরিবারের ভালো-মন্দ যত ধরনের মানুষ থাকে সেই সব চরিত্রগুলো দেখানো হয়। আমাদের নাটকে দর্শক ফেরাতে হলে এই বিষয়গুলোর দিকে নির্মাতাদের ভাবতে হবে। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র এই তিন মাধ্যমের মধ্যে চলচ্চিত্রেই বেশি ব্যস্ত থাকতে চান বলে জানান তারিক আনাম খান।

আলাপনে সর্বশেষ তারিক আনাম কথা বলেন বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে। তিনি বলেন, এবারের বাংলাদেশের পারফমেন্স নিয়ে আমি ব্যক্তিগত ভাবে বেশ খুশি। তারা দুর্দান্ত খেলছে। সব শ্রেনীর ক্রিকেট প্রেমিদের কাছে এবারের বাংলাদেশ টিম শক্তিশালী বলেই বিবেচিত। আমি একটা কথা বলতে চাই, বাংলাদেশকে এখন ছোট দল ভাবার কিছু নেই। যে কোনো দলকে হারানোর শক্তি বাংলাদেশের আছে।